এআইআইবি ও বাংলাদেশের অবস্থান

হাসান মেহেদী, দৈনিক সমকাল
২০ জুলাই ২০১৬
-------------------------

দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চাপান-উতোর চলার পর সত্যি সত্যিই চালু হয়ে গেল এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি)। শুধু চালু হওয়াই নয়, ইতিমধ্যে ব্যাংকটি প্রথম একগুচ্ছ ঋণ দিয়েও ফেলেছে। ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও তাজিকিস্তানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশও একটি ঋণ পেয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিসঞ্চালন ব্যবস্থা হালনাগাদ ও সম্প্রসারণ প্রকল্প (বিডিএসইউপি) নামের এ ঋণটির আওতায় রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ৮৫ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন, দুটি সাব-স্টেশন আধুনিকায়ন এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন এলাকাগুলোতে ২৫ লাখ নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে।

এআইআইবি প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রধান ভূমিকায় রয়েছে সমাজতান্ত্রিক চীন। এক সময় চরম দারিদ্র্যে নিপতিত চীন বিগত তিন দশকজুড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাপরাক্রমশালী হয়ে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন, রফতানি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চীনকে দিয়েছে বিরাট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, যা পৃথিবীর সর্বোচ্চ। অঙ্কটা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় পাঁচগুণ। ইতিমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে রাশিয়া ষষ্ঠ, ভারত অষ্টম ও ব্রাজিল নবম স্থানে পেঁৗছে গেছে।

মধ্যম আয়ের দেশ হলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির আকার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এসব দেশকে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ করার আন্তর্জাতিক বাজার যেমন দরকার, তেমনি আন্তর্জাতিক আর্থ-রাজনৈতিক ক্ষমতায় তারা নিজস্ব অবস্থানও চায়। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)। এছাড়া এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক ক্ষমতার অনুপাতে এসব বনেদি প্রতিষ্ঠানে নব্য ধনীরা নিজস্ব অবস্থান করে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু বনেদি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা জাপান। ২০০০ সালের পর কয়েকবার অনুরোধ জানালেও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবিতে চীন বা ভারতের শেয়ারের সংখ্যা বাড়াতে রাজি হয়নি নিয়ন্ত্রক দেশগুলো।

তাই অবশেষে তৈরি করতে হলো নতুন ব্যাংক। অগ্রসর উন্নয়নশীল দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার যৌথ উদ্যোগে গঠিত হলো ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা ব্রিকস ব্যাংক। ব্রিকস্ ব্যাংকের মাধ্যমে পরস্পরের উন্নয়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও চীনা পুঁজির বিপুল অংশ পড়ে রইল অলস অবস্থায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় বন্ড ক্রয়, পৃথিবীজুড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্প এবং চীনা বেসরকারি ব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পরও অলস পড়ে রইল বিপুল পরিমাণ অর্থ। এদিকে ২০১১ সালে এডিবি এক প্রাক্কলনে জানাল যে, অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এশিয়ায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৬২৪ লাখ কোটি টাকা দরকার। তাই তো ২০১৪ সালে বোয়াও সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হলো, এশিয়ার অবকাঠামো উন্নয়নে গঠিত হবে নতুন আরেকটি বহুপক্ষীয় ব্যাংক।

৫৭টি দেশের অংশগ্রহণে ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ সৃষ্টি হলো নতুন ব্যাংক এআইআইবি। এ দেশগুলোর ৩৭টি এশীয়, ১৭টি ইউরোপীয়, দুটি আফ্রিকান এবং একটি দক্ষিণ আমেরিকান দেশ। দেশগুলোর মধ্যে যেমন সম্পদের পার্থক্য আছে, তেমনি নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রেও আছে বিরাট ফারাক। 'সমাজতান্ত্রিক' চীনের নেতৃত্বে এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত বলে অনেকেই আশা করেছিলেন এআইআইবিতে 'এক দেশ এক ভোট' নীতি অনুসরণ করা হবে। কিন্তু তা হয়নি, পুঁজি লগি্নকারী অন্যান্য বহুজাতিক ব্যাংকের মতো এখানেও শেয়ারের বিপরীতে ভোটাধিকার প্রদান করা হয়েছে।

নতুন ব্যাংক এআইআইবি যেহেতু অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেহেতু ধারণা করাই যায় যে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকেই এর বাড়তি নজর থাকবে। প্রথম অনুমোদিত হওয়া ঋণগুলোর দিকে তাকালেও এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু আশঙ্কার জায়গা হলো, বাংলাদেশসহ এসব দেশের নাগরিক ও পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। কোনো কোনো দেশে সুরক্ষা বিষয়ক আইনি কাঠামো থাকলেও কদাচিৎ তার প্রয়োগ হয়।

এআইআইবিতে বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা সদস্যপদ গ্রহণ করেছে। ব্যাংকটিতে দক্ষিণ এশিয়ার সম্মিলিত ভোট ৬.৮২ শতাংশ এবং সেখানে বাংলাদেশের ভোট ০.৬৩ শতাংশ। অন্যদিকে শুধু চীনের ভোট ২৬.৬ শতাংশ এবং চীনসহ ভারত, রাশিয়া, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স একত্রিত হয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কেননা এই সাতটি দেশের ভোট ৫২ শতাংশ, যা বাকি ৫০টি দেশের তুলনায় বেশি। অপরদিকে কম্বোডিয়া, জর্জিয়া, লাওস, তাজিকিস্তান, মাল্টা বা মালদ্বীপের মতো ২০টি দেশ একত্র হয়েও নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না। এ শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যাংকটির 'পরিবেশগত ও সামাজিক ফ্রেমওয়ার্ক' বা ইএসএফ। এ নীতিমালা বাংলাদেশের পরিবেশ আইন ও নীতিমালা তো বটেই, এডিবি বা বিশ্বব্যাংকের সংশিল্গষ্ট নীতিমালার চেয়েও দুর্বল।

সংশিল্গষ্ট প্রকল্পটি বাংলাদেশের আইনানুযায়ী 'লাল' শ্রেণিভুক্ত অর্থাৎ এ প্রকল্পের জন্য 'পরিবেশগত প্রভাব নিরীক্ষা' ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন। অপরদিকে ইএসএফ অনুসারে এ প্রকল্প 'বি' শ্রেণিভুক্ত অর্থাৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু 'প্রাথমিক পরিবেশ সমীক্ষা'ই যথেষ্ট। ইএসএফ অনুসারে, প্রকল্পের ফলে পরিবেশগত মান বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে এআইআইবি কর্তৃপক্ষ সংশিল্গষ্ট জাতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবে। এছাড়া এআইআইবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় নাগরিক সমাজের সুযোগ নেই বললেই চলে। গত মাসে (জুন ২০১৬) অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভায় বাছাইকৃত নাগরিক প্রতিনিধি ব্যতীত প্রবেশাধিকার ছিল ভয়াবহ রকম সীমাবদ্ধ।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। সেজন্য অভ্যন্তরীণ উৎসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকেও ঋণ গ্রহণ করতে হয়। সাধারণত বহুপক্ষীয় ব্যাংক এডিবি বা বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়ে ঋণের কোনো সুদ দিতে হয় না। কিন্তু এআইআইবির ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নকালেও বার্ষিক শতকরা ১.১৫ হারে সার্ভিস চার্জ বা সুদ পরিশোধ করতে হবে। ফলে এ ঋণ থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আগেই ব্যাংকটিকে সুবিধা দিয়ে যেতে হবে।

তাই উন্নয়নের জন্য এডিবিসহ সনাতনী বহুপক্ষীয় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে দর কষাকষির জন্য এআইআইবির সুযোগটা যেমন ব্যবহার করা দরকার, তেমনি নতুন এই ব্যাংক যেন বাংলাদেশের ওপর ঋণ ও সুদের নতুন বোঝা চাপিয়ে না দেয়, সেজন্য সতর্ক থাকা দরকার।